শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের স্বামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের মানুষের ন্যায্য অধিকার ও সর্বশেষ বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ৪৬৮২ দিন অর্থ্যৎ ১৩ বছর ১৪ দিন জেল খেটেছেন। এই দীর্ঘ সময় স্বামীর অবর্তমানে সকল দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে বঙ্গবন্ধুকে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও উৎসাহ উদ্দীপনা যারা দিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, তাঁর সহধর্মীনী বা তাঁর জীবন সঙ্গী এই মহিষী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে নিরবচ্ছিন্ন প্রেরণার অনন্য প্রতীক বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।
বাংলাদেশের পাঁচবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন তাঁর স্মরন শক্তি ছিল অসম্ভব; তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা ছিল অতুলনীয়। তাই মাকে রসিকতা করে বলতেন "জীবন্ত টেপরেকর্ডার"। সারাদিন সাধারণ মানুষ ও দলীয় কর্মী-নেতাদের মুখে দেশের পরিস্থিতি শুনতেন আর রাত জেলখানায় সাক্ষাৎকালে অবিকল ও নিখুঁতভাবে তা বঙ্গবন্ধুর কাছে তুলে ধরতেন। সাধারণ মানুষের ধমনীর স্পন্দন বুঝে বঙ্গবন্ধুকে সবসময় সহায়তা করেছে। বঙ্গবন্ধুর অধিকাংশ সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের পক্ষে যেত, এর পেছনে কারণ হিসাবে বেগম মুজিবের অবদানকে উল্লেখ্য করে।
১৯৬৯ সনে মার্কিন State Department ২৬শে সেপ্টেম্বর উল্লেখ করেন তাঁর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, রেণু তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং প্রখর স্মরণশক্তির অধিকারী বলে উল্লেখ্য করেছেন। অতি সাধারণ দেখতে, মৃদুভাষী, কাউকে কিছু বুঝতে দেন না। আড়ালে থেকে কাজ করেন বলেই তাঁকে শনাক্ত (Identify) করা বেশ মুশকিল। শহরের ৩০ থেকে ৩৫ জন লোক (আরও বেশি হতে পারে) লোকাল ভেহিক্যাল ড্রাইভার (রিকশাচালক), তাঁদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ। তিনি ও মাঝে মাঝে প্রয়োজনে এই লোকাল ভেহিক্যালে (রিকশায়) চলাচল করতেন। তাঁদের মাধ্যমে নানাবিধ তথ্য সংগ্রহ করে সেটাই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে দক্ষ রাজনীতিবিদ শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট অবিকৃতভাবে প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরা, বিচক্ষণ মুজিব সহজেই সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্ট বুঝে সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।
রাজনৈতিক সংকটকালে চরম নজরদারির মধ্যেও বঙ্গমাতা সুচতুর কৌশলে বোরকা পরে, নিজের বিশ্বস্ত রিকশাচালদের ব্যবহার করতেন, প্রয়োজনে রিকশায় চেপে গোপন জায়গায় যেতেন ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াস ও আওয়ামী লীগের উদীয়মান নেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ও তথ্য আদান-প্রদান করতেন। পাকিস্তানি পুলিশ বা গোয়েন্দারা কখনোই তাঁকে চিহ্নিত করতে পারেনি। দিন, তারিখ ও সময়ের ঐতিহাসিক দলিল ধরে বঙ্গমাতার সুবিশাল ও নজিরবিহীন অবদানগুলো স্বল্প পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবুও কয়েকটি ঘটনা অবতারনা করলাম। ১. ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬৬) ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন এবং দেশে ফিরে দেশব্যাপী প্রচার শুরু করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই কঠিন সময়ে বঙ্গমাতা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের নিজ বাড়িতে এনে বিভিন্ন পরামর্শ দেন এবং ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ৬ দফার পক্ষে দেশব্যাপী যে ঐতিহাসিক আন্দলনের ও প্রচারের জন্য তিনি নিজের গয়না বিক্রি করে অর্থ যোগার দেন। ২. ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও প্যারোলে মুক্তির নজিরবিহীন প্রতিবাদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় (১৯৬৮) যখন বঙ্গবন্ধুকে ১ নম্বর আসামি করে ঢাকা সেনানিবাসে বন্দি রাখা হয়, তখন ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে 'প্যারোলে' মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব করে। জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতারা যখন প্যারোলে রাজি হতে বঙ্গবন্ধুকে চাপ দিচ্ছিলেন, তখন বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে বার্তা পাঠিয়ে — প্যারোলে নয়, নিঃশর্ত মুক্তি হলেই গোলটেবিল মিটিং এ যোগ দেওয়া, না হয় নয়। এই ব্যাপারে অটল থাকার জন্য পরামর্শ দেন।
বঙ্গমাতার এই সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। পরের দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাঁকে, 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করে। ৩. ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তান সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণার সময় দলের আর্থিক সংকটে তিনি নিজের ব্যক্তিগত জমানো টাকা ও দেশের নিজের জমি বিক্রয় করে বড় ধরনের আর্থিক যোগান দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেবে কি না তা নিয়ে নেতাদের মধ্যে দ্বিধা থাকলেও তিনি বঙ্গবন্ধুকে বুঝান জনগণ তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। তার দৃঢ়তা বঙ্গবন্ধুকে সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করত। ৪. ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ ও মহান মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে যাওয়ার আগে বিভিন্ন বুদ্ধিজীবি ও নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুকে বিভিন্ন বক্তব্যের খসড়া তৈরি করে দিচ্ছিলেন। তখন বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে ধীরস্বরে বলেছিলেন, তুমি কারো কথা শুনবা না, তোমার মন যা আসবে এবং তুমি যা বিশ্বাস করো, শুধু সেটুকুই বলবে। বঙ্গবন্ধুর সেই তাৎক্ষনিক ভাষণ আজ ”ইউনেস্কো স্বীকৃত সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ভাষণ।" ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে স্বাধীনতা ঘোষনার পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে, এর পর থেকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন পর্যন্ত পুরো ৯ মাস বঙ্গমাতা ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে সন্তানদেরসহ বন্দি অবস্থায় চরম মানসিক উৎকণ্ঠায় কাটান। নিজের বন্দিদশার মধ্যেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গোপনে আর্থিক সহায়তা ও বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে সাহস জুগিয়ে গেছেন। এই ১৮ নং বাড়ি থেকে নিজ সন্তান শেখ জামাল যার বয়স ১৮ বছরের মত তাকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য ভারতে পাঠিয়ে দেন। ৬. স্বাধীনতা-উত্তর বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন (১৯৭২-১৯৭৫) স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু যখন ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন দেশ পুনর্গঠন করছিলেন, বঙ্গমাতা তখন বিরঙ্গনা ও সাধারণ নারীদের পুনর্বাসনের জন্য নিবিড় ভাবে কাজে করেন। বিশেষ করে যুদ্ধেরে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত বীরাঙ্গনা মা-বোনদের পুনর্বাসন এবং সামাজিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরিতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নির্যাতিত বহু নারীর বিয়ের আয়োজন করেন এবং নিজ হাতে অলংকার উপহার দিয়ে তাঁদের নতুন জীবন উপহার দেন। বঙ্গমাতা কোনোদিন সরকারি আড়ম্বর বা ফার্স্ট লেডির বিলাসী পোশাক গ্রহণ করেননি; চিরকাল একজন সাধারণ বাঙালি নারীর মতো বাস করেছেন। ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করা এই বীর রমণী ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে ঘাতকদের নির্মম বুলেটের মুখোমুখি হন। ঘাতকের দল যখন জাতির পিতাকে হত্যা করে তখন তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলেছিলেন—"তোমরা ওঁকে মেরে ফেলেছ, আমাকেও মেরে ফেল।" সারাজীবন যিনি আলো-আঁধারে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকেছেন, মরণেও সেই বিশ্বস্ত সঙ্গী তাকে আনুসরণ করেছে। কালরাতের সেই রক্তাক্ত বিচ্ছেদেও তিনি মিশে গেছেন বঙ্গবন্ধুর রক্তস্রোতে কিছু বলার ভাষা নাই, শুধু প্রর্থনা- মহান রাব্বুল আলামিন জান্নাত বাসী করুন এই মহান নারীকে। লেখক: অশ্রু হাসি, রাজনীতিবিদ ও কলামিস্ট