১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই দেশটির শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের প্রতি বৈষম্যমূলক ও অসম্মানজনক আচরণ শুরু করে। পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে কনভোকেশন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন।
উভয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত শেখ মুজিবসহ বাঙালি নেতৃবৃন্দ ও ছাত্রসমাজ এই ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানান। মূলত এখান থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে বিভক্তির বীজ বপিত হয়।
সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি, আর পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫ কোটি। রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলাকেই প্রাধান্য দেওয়া যৌক্তিক ছিল। কিন্তু তার পরিবর্তে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভাষা উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক। এই সিদ্ধান্ত বাঙালি জাতিকে গভীরভাবে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ করে।
অন্যদিকে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য-সবকিছুতেই বাঙালিদের বঞ্চিত করা দেখে শেখ মুজিবুর রহমানসহ যারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছেন, তারা সবাই ক্ষুব্ধ হন। দেখা গেল, পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থার সর্বত্র বৈষম্য সৃষ্টি এবং বাঙালিদের নিচু জাতি হিসেবে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অসম্মান করা পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের মারাত্মকভাবে ব্যথিত করে। এই অবস্থায় বাঙালিদের সমমর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ মুজিবসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দ বারবার সভা করেন এবং ১৯৪৯ সনের ২৩শে জুন ঢাকার কে. এম. দাস লেনের “রোজ গার্ডেন প্যালেসে” এক সভায় আওয়ামী লীগ দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সহসভাপতি আতাউর রহমান খান, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে দলটি গঠন করা হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার একজন মূল কারিগর হলেও প্রতিষ্ঠাকালীন কোনো নির্বাহী পদ গ্রহণ করেননি। ১৯৪৮ সনে শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে ৪ঠা জানুয়ারি নাইম উদ্দিন আহম্মদ ও খালেক নেওয়াজের নেতৃত্বে ছাত্র সংগঠন “ছাত্রলীগ” প্রতিষ্ঠিত হয়। একইভাবে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যুগপৎ আন্দোলনের জন্য ১৯৬৯ সনে শ্রমিক লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐ সময় শেখ মুজিব ও অন্য নেতারা লক্ষ্য করেন যে, পাকিস্তান গণতন্ত্র, সাংবিধানিক ব্যবস্থা ও জনপ্রতিনিধিদের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে একের পর এক সামরিক শাসন জারি করে বিশেষ গোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল। আরও লক্ষ্য করা যায় যে, অবিচার ও বৈষম্যের পাশাপাশি পশ্চিমা বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর দ্বারা পাকিস্তান পরিচালিত হচ্ছিল। তাদের স্বার্থ ও সুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য পূর্ব পাকিস্তানেও কিছু সুবিধাভোগী গোষ্ঠী সৃষ্টি করা হয়, যাতে জনরোষ মোকাবিলা করে দুঃশাসন অব্যাহত রাখা যায়। এদিকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিভক্তি ও মতদ্বন্দ্ব থাকলেও শেখ মুজিব, একজন তরুণ নেতা হিসেবে, প্রতিবাদ ও বারবার কারাভোগ করেও দমেননি। অন্যদিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানীর পরস্পরের মধ্যে মতবিরোধের কারণে ১৯৫৭ সনের ১৮ই জুলাই মাওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ অবস্থায় ছাত্রসংগঠন ও আওয়ামী লীগের সকল নেতাকর্মী শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সারা দেশে শক্তিশালী অবস্থান নেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়া এবং আওয়ামী লীগ ত্যাগ করলেও শেখ মুজিবকে পছন্দ করতেন। সেই কারণে সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে তাঁর সফলতা কামনা করতেন। কারণ তারা মনে করতেন, শেখ মুজিব তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, কঠোর পরিশ্রমী ও ত্যাগী; তাঁর পক্ষে বাঙালি জাতির অধিকার আদায় করা সম্ভব। তাঁর গুণাবলির কারণে পশ্চিম পাকিস্তানেও অনেক নেতা শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। বাঙালিরা যাতে সম্মানজনকভাবে বাঁচতে পারে, সেই জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছাড়াও দেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী, যেমন রেহমান সোবহান, নুরুল ইসলাম, আনিসুর রহমানসহ একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে ৬ দফা দাবি প্রণয়নে বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন। এই ৬ দফা বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করান। পরবর্তীতে এই ৬ দফার পক্ষে “আমাদের বাঁচার দাবি, ৬ দফা”—এই স্লোগানে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়। এই উপলব্ধি থেকে গোটা জাতি ৬ দফার পক্ষে অবস্থান নেয়। মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৩৬.৩০% পশ্চিম পাকিস্তানে বাস করত এবং ৬৩.৭৭% পূর্ব পাকিস্তানে বাস করত। অথচ পাকিস্তানের আয়ের ৭১.১৬% পশ্চিম পাকিস্তানে এবং ২৮.৮৪% পূর্ব পাকিস্তানে বরাদ্দ দেওয়া হতো। কিন্তু সিংহভাগ আয় আসত পূর্ব পাকিস্তানের পাট, চামড়া, চা রপ্তানি ইত্যাদি থেকে। বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতি এবং এ দেশের জন্য কী পরিমাণ নির্যাতন ও কারাভোগ করেছেন, তা লিখতে গিয়ে বারবার আমার চোখে পানি আসে। যার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। • প্রথমে ১৯৩৮ সনে ছাত্রনেতা হিসেবে ব্রিটিশবিরোধী ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কারণে গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেফতার হয়ে ৭ দিন জেলে ছিলেন। • কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ছাত্র থাকাকালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ব্যাপক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। • রাষ্ট্রভাষা উর্দুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ গ্রেফতার হয়ে ১৫ই মার্চ মুক্তি লাভ করেন। মানুষের মারাত্মক খাদ্যাভাবের সময় বুভুক্ষু মানুষের পক্ষে আন্দোলন করতে গিয়ে ১১ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ গ্রেফতার হয়ে ২১শে জানুয়ারি মুক্তি লাভ করেন। • ১৯৪৯ সালের ১৯শে এপ্রিল ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায্য দাবির পক্ষে আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে ১৯শে জুলাই পর্যন্ত জেল খাটেন। • ব্যাপক দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে ১৪ই অক্টোবর ১৯৪৯ থেকে ২৬শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ পর্যন্ত ২ বছর ৫ মাস জেল খাটেন।
• সর্বশেষ ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই পাকিস্তানি আর্মি রাত আনুমানিক ২টার সময় তাঁকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৮ই জানুয়ারি ১৯৭২ সালে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য দূর ও ন্যায্য সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই দল আওয়ামী লীগ। শেষ পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় জাতিসংঘের সদস্যপদ পাওয়াসহ যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও ৫২টি দেশের স্বীকৃতি লাভ করে বাংলাদেশ। উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ করার সুযোগ তাঁকে দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও জাতির পিতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি বঙ্গভবনে নয়, নিজের সাধারণ ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িতে থাকতেন, একজন সাধারণ মানুষের মতো। তিনি ভাবতেন, পাকিস্তানিরা তাঁকে মারেনি—বাঙালিরা কি তাঁকে মারতে পারবে? ১৯৭০ সালে জাতীয় নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬০ আসন লাভ করে। শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে নির্বাচিত হয়। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকেরা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বাঙালিদের হত্যা-নিপীড়ন শুরু করে। তখন ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ১০ লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশে বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতায় বলেন, “জনগণের শাসনব্যবস্থা কায়েমের জন্য যখনই ক্ষমতায় যেতে চেয়েছি, তখনই ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হয়নি। পাকিস্তানের ২৩ বছরের ইতিহাস রক্ত দিয়ে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। আমরা জীবন দিয়ে একসাথে থাকার চেষ্টা করেছি। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আমি যদি আর হুকুম দিতে নাও পারি, হানাদারমুক্ত হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। জয় বাংলা।” অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন এবং স্ব স্ব অবস্থান থেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তারপরও পাকিস্তানের শাসক ইয়াহিয়ার অনুরোধে আলোচনায় বসেন, কিন্তু সকল আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে, অর্থাৎ ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। যা টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে বিডিআর হেডকোয়ার্টারসহ অনেক আওয়ামী লীগ নেতার নিকট পাঠিয়ে দেন। তা পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক পত্র-পত্রিকা এবং টেলিভিশনে প্রচার হয়। • ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার সদস্য হলেও ১৫ দিনের মাথায় কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা বাতিল করে ৩০শে মে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। • আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করে তাঁকে জেলে পাঠান এবং ৭ই ডিসেম্বর ১৯৬০ পর্যন্ত জেলে রাখেন। • ৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ সালে নিরাপত্তা আইনে তাঁকে আটক করা হয় এবং ১৮ই জুন ১৯৬২ পর্যন্ত জেলে রাখা হয়। • রাষ্ট্রদ্রোহী বক্তৃতার অভিযোগ তুলে তাঁকে ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত মোট ৬৬৫ দিন জেলে রাখা হয়। • বাঙালিদের প্রতি অবিচার রোধে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবিতে স্বায়ত্তশাসন চাওয়ায় ১৯৬৬ সালের ৮ই মে থেকে ১৯৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার নামে আটক রাখা হয়। কিন্তু জনগণের ব্যাপক আন্দোলনের কারণে তাঁকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয়।
তাঁর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী এবং কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি করে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার নির্দেশ দিয়ে যান। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষের জীবন ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়।
এই ধারাবাহিক বর্ণনার পর যাদের ন্যূনতম মনুষ্যত্ব আছে, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা আছে—তারা কি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছাড়া কাউকে ঘোষক বা জাতির পিতা বলতে পারেন? পরকাল ও ইতিহাস কি তাদের ক্ষমা করবে? আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, দয়া করে আমাদের ইতিহাসে মিথ্যার স্থান যেন না হয়। আজ যারা মুক্তিযুদ্ধকে ব্যঙ্গ করে, তাদের পূর্বসূরিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। যে পাকিস্তান আমাদের শাসন-শোষণ করেছে, মা-বোনদের ধর্ষণ করেছে এবং ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে, এখন তার পক্ষেই তারা বুক ফুলিয়ে কথা বলে। আর যে ভারত আমাদের এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে এবং নয় মাস খাদ্যের ব্যবস্থা করেছে, স্বাধীনতার পর থেকে তাদের সঙ্গে আমাদের বিবাদ লাগানোর জন্য সর্বদা চেষ্টা করা হয়। কারণ তারা মনে করে, ভারত সাহায্য না করলে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ স্বাধীন করতে পারত না। তাদের পূর্বপুরুষেরা পাকিস্তানের সমর্থন নিয়ে যে অত্যাচার স্বজাতির ওপর চালিয়েছিল, তা অব্যাহত রেখে রাজকীয় জীবনযাপন করতে পারত। তাদের উত্তরসূরীরাও ভারতের সঙ্গে বিবাদ সৃষ্টি করার জন্য উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে। তারা বলে, আওয়ামী লীগ ভারতকে সব দিয়ে দিয়েছে, কিন্তু ভারত বাংলাদেশকে কিছুই দেয়নি। তা হয় না। বাস্তবতা হলো, পাকিস্তান আমল থেকে সৃষ্ট ছিটমহল জটিলতা শেখ হাসিনা মীমাংসা করেছেন। সেখানে বাংলাদেশ পেয়েছে ১৭ হাজার একর জমি, আর ভারত পেয়েছে ৭০০ একর। এটি কি ভারতকে দেওয়া, নাকি ভারত থেকে নেওয়া? পাকিস্তান সৃষ্টির সময় থেকে সমুদ্রসীমা নিয়ে যে বিরোধ ছিল, তা শেখ হাসিনার সরকার ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে মীমাংসা করেন। যার মধ্যে বাংলাদেশ পায় ১৯,৪৬৭ বর্গকিলোমিটার এবং ভারত পায় ৬,১০৫ বর্গকিলোমিটার। এতেই কি প্রমাণিত হয় না যে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের স্বার্থে কখনো কোনো দেশের সঙ্গেই আপস করেনি? বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর বলেছিলেন, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি— “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়।” সেই নীতি অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে ফেরার পথে দিল্লি বিমানবন্দরে নেমে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে বলেন, “ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশ থেকে কবে ফেরত যাবে?” উত্তরে তিনি বলেন, “আপনি যখন চাইবেন, তখনই যাবে।” এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাবর্তন করে। সকল বিষয়ে ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদার নীতি আওয়ামী লীগ সরকার অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশের স্বার্থে একমাত্র আওয়ামী লীগ সরকারই পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানি এবং কম দামে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ভারত-বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বিনষ্ট করার জন্য এবং জনমনে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন মিথ্যা অপপ্রচার করা হয়। তারা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের ধ্বংস চায়। আমরা যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন হওয়ার পূর্বের অবস্থা ও পরের অবস্থা পর্যালোচনা করি, দেখব ইউরোপে পণ্য সরবরাহ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সেবাপণ্যের মূল্যসহ সকল খাতে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। সে জন্য দার্শনিকরা বলেন, যারা বোকা তারা প্রতিবেশীর সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করে, আর বুদ্ধিমানরা দূরের বন্ধুর চেয়ে কাছের শত্রুকেও বন্ধু বানায়। এতে উভয়েরই উন্নতি হয়। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর হাতে গড়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা যখন ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসেন, তখন আমরা ছিলাম একটি হতদরিদ্র দেশ। মাথাপিছু আয় ছিল ৩৭২ ডলার, গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল ১০ ভাগ, খাদ্যে ঘাটতি ছিল প্রায় ৫০ লক্ষ টন, শিক্ষার হার ছিল ৩৮ শতাংশ।
আর এখন মাথাপিছু আয় ২,৮২৪ ডলার, বিদ্যুৎ সংযোগ শতভাগ, খাদ্যে কোনো ঘাটতি নেই, শিক্ষার হার ৭৭ শতাংশ। দারিদ্র্যের হার ৫৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮.৭০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। হতদরিদ্র দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করা হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নত দেশের পথে যাত্রা শুরু হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ প্রতিষ্ঠা করেছে। তাঁর কন্যার নেতৃত্বে দেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে স্থান করে নিয়ে উন্নত দেশের পথে যাত্রায় ছিল। কিন্তু জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এ কোটা আন্দোলনের নামে সারা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়। নিজেরা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নাম দিয়ে নিজেদের লোককে হত্যা করে আওয়ামী লীগের ওপর দোষ চাপায়। ষড়যন্ত্রকারীরা নিজেদের ইচ্ছামতো আইন দিয়ে পুলিশ ও বিচারবিভাগকে নিজেদের মতো ব্যবহার করে বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দেয়। অসংখ্য সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশের আইজিপি, প্রধান বিচারপতি, সচিব, সাংবাদিকসহ অনেককে জেলে পুরে নির্যাতন করা হয়। ভয়-ভীতির মাধ্যমে ইচ্ছামতো সাজা দেওয়া হয়। মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ দিয়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু এ দেশের আশি ভাগ মানুষ অধীর আগ্রহে আওয়ামী লীগের পুনঃপ্রত্যাবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছে। ইনশাআল্লাহ, আওয়ামী লীগ আবার নেতৃত্ব দিয়ে উন্নত ও গর্বিত বাংলাদেশ গড়বে। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।