সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ২০২৬-২৭ সেশনের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করেছে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল (নীল প্যানেল)। ১৪টি পদের বিপরীতে সভাপতি ও সম্পাদকসহ মোট ১৩টি পদে জয়ী হয়েছেন তারা। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত প্যানেল (সবুজ প্যানেল) মাত্র ১টি সদস্য পদে জয় পেয়েছে এবং এনসিপি সমর্থিত প্যানেল কোনও পদেই জয়ী হতে পারেনি।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সমর্থক আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ায় সাধারণ আইনজীবী ও বিশ্লেষকদের মাঝে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার ভোটারদের আগ্রহ ও সংখ্যা বেশি থাকা সত্ত্বেও ১১ হাজার ৯৭ জন ভোটারের মধ্যে দুই দিনে মাত্র ৪,০৪৮ জন আইনজীবী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এদের মধ্যে প্রথম দিনে ১৭৭১ জন এবং দ্বিতীয় দিন ২২৭৭ জন আইনজীবী ভোট দিয়েছেন। মনোনয়নপত্র বাতিল ও ভোটারদের প্রতিক্রিয়া
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। তবে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডহক কমিটি বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তাদের প্রায় ৪২টি মনোনয়নপত্র বাতিল করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সরকার পতনের পর প্রায় দুই বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন নিয়ে সাধারণ আইনজীবীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ থাকলেও, বড় একটি অংশের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় সাধারণ ভোটারদের মাঝে এর একটি বিরূপ প্রভাব পড়ে।
বিজয়ীদের তালিকা
বিএনপি সমর্থিত প্যানেল থেকে বিজয়ীরা হলেন— বিএনপি সমর্থিত প্যানেলের সভাপতি পদে ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, দুটি সহসভাপতি পদে মো. মাগফুর রহমান শেখ ও মো. শাহজাহান, সম্পাদক পদে মোহাম্মদ আলী, কোষাধ্যক্ষ পদে মো. জিয়াউর রহমান, দুটি সহসম্পাদক পদে মাকসুদ উল্লাহ ও মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম মুকুল।
সদস্য পদে ব্যারিষ্টার এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী, এ কে এম আজাদ হোসেন, মো. কবির হোসেন, মো. টিপু সুলতান, মো. জিয়া উদ্দিন মিয়া ও ওয়াহিদ আফরোজ চৌধুরী বিজয়ী হয়েছেন। ৭টি সদস্য পদের একটিতে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াত সমর্থিত প্যানেলের মো. আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী।
‘আইনের অজুহাতে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়া হয়েছে’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মামুন মাহবুব বিগত বছরগুলোর বারের নির্বাচন নিয়ে স্মৃতিচারণ করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তৎকালীন ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র ফজলে নূর তাপসের নির্দেশে তার অনুসারীরা নির্বাচনে আইনজীবীদের আহত করা, বর্তমান বারের সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকনকে নির্যাতন, রুহুল কুদ্দুস কাজলকে (বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল) গ্রেফতার এবং মারধরের মতো জঘন্য অপকর্ম করেছে। তবে এবারের নির্বাচনে তারই একটি ভিন্ন ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করলাম।”
তিনি দলীয় প্যানেল সংস্কৃতির সমালোচনা করে বলেন, “বিগত ১৫-২০ বছর ধরে শীর্ষ দুটি দল বারের গঠনতন্ত্র ও সংবিধান লঙ্ঘন করে প্যানেলভিত্তিক নির্বাচন দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের সময় সরাসরি মারামারি হতো, আর এবার বিএনপি চালাকি করে আইনের অজুহাত দেখিয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বাদ দিয়েছে। এরা আসলে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো সমিতির গঠনতন্ত্র পুরোপুরি মেনে নির্বাচন করা।”
‘আওয়ামী লীগকে দূরে রাখা মবতন্ত্রের শামিল’
নির্বাচন নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “চব্বিশের এত বড় গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের অঙ্গীকার ছিল একটি উন্নত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা করা। অতীতে অনেকে নির্বাচন থেকে প্রতিপক্ষকে দূরে রাখার অধমের কাজ করেছে, কিন্তু তারা অধম বলে আমাদের উত্তম হতে সমস্যা কোথায়? যারা কেবল দলটির (আওয়ামী লীগ) সমর্থক, তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু নতুন করে প্রার্থিতা বাতিলের এই সংস্কৃতি শুরু করা মানে ‘মবতন্ত্র’ চালু করা।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বিগত দিনে আমরা বিএনপির সঙ্গে মিলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য লড়েছি। আশা ছিল আওয়ামী আমলের কালচার থেকে বের হয়ে আসার। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই প্রত্যাশার বিচ্যুতি ঘটলো। আওয়ামী লীগের অনেকে অগণতান্ত্রিক কাজ করে দেশছাড়া ও পলাতক থাকলেও, আমাদের উচিত ছিল সবার জন্য একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।”
‘নির্বাচন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ হয়েছে’
অপরদিকে এবারের নির্বাচন সাব-কমিটির আহ্বায়ক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী রাজনৈতিক দলগুলোর এই সমালোচনা নাকচ করে দিয়েছেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “নির্বাচনে কোনও এক পক্ষ আসেনি— এমনটা বলার কোনও সুযোগ নেই। আমার কাছে ভোটার বা প্রার্থী হিসেবে সবাই একপক্ষ। গত কয়েক বছরের নির্বাচনে কেন্দ্রের ভেতর মারামারি ও বিশৃঙ্খলা দেখা গেলেও এবার নির্বাচন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ হয়েছে। দুই-একজন অন্যের হয়ে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যা আমরা ধরে ফেলেছি।”