ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান দলগুলোর ইশতেহারে প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে দেশের অর্থনীতি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট এবং বিনিয়োগের স্থবিরতার প্রেক্ষাপটে ভোটারদের আশা এখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির ওপর। এই পরিস্থিতিতে প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দল—বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি—তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে দেশের অর্থনীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
বিএনপি তাদের ইশতেহারে দেশের নীতিগত ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়েছে। দলটি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষ প্রকাশ করেছে। বিশেষভাবে কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং রফতানি সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হয়েছে। আইসিটি খাতে এক মিলিয়ন নতুন চাকরি, স্টার্টআপ সহায়তা, আঞ্চলিক ই-কমার্স হাব গড়ে তোলা এবং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রফতানি সম্প্রসারণ বিএনপির পরিকল্পনার মূল অংশ। সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ফ্যামিলি কার্ড ও ফারমার্স কার্ড চালুর মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষ এবং কৃষকদের সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। করনীতি সংস্কারের মাধ্যমে ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও উল্লেখযোগ্য। এছাড়া পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন, সুনীল অর্থনীতি এবং সমুদ্রভিত্তিক শিল্প, মৎস্য আহরণ ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের উন্নয়ন দলটির দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ।
জামায়াতের ইশতেহার উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে দৃষ্টিকোণ ভিন্ন। দলটি ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার এবং মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, আইসিটি, এসএমই, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আর্থিক খাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা, আমদানিনির্ভরতা ৩০ শতাংশ কমানো এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধাপে ধাপে ৭ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা ও করনীতির ক্ষেত্রে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা পাঁচ লাখ টাকা এবং করপোরেট কর হার কমিয়ে ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এনসিপি তাদের ইশতেহারে চাকরি সৃষ্টিকে প্রধান অগ্রাধিকার দিয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে তারা এক কোটি মানসম্মত চাকরি তৈরির পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া ১০ হাজার কোটি টাকার উদ্যোক্তা তহবিল গঠনের মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তা, নারী ও এসএমই ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ সহায়তা প্রদান করা হবে। সর্বনিম্ন মজুরি প্রতি ঘণ্টা ১০০ টাকা নির্ধারণ, শ্রমিক নিরাপত্তা বিমা ও পেনশন প্রবর্তন, করনীতি সংস্কার এবং নগদহীন অর্থনীতিতে ধাপে ধাপে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত।
বিভিন্ন বিশ্লেষক মনে করেন, দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা সহজ হলেও তা বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ আস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অপরিহার্য। বিএনপি নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়েছে, জামায়াত উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কিন্তু বাস্তবায়নের রূপরেখা স্পষ্ট নয়, আর এনসিপি চাকরি ও উদ্যোক্তা ভিত্তিক বাস্তবমুখী পরিকল্পনা সামনে রেখেছে।
ডার্ক টু হোপ/এসএইচ