স্পেন সরকার ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে দেশটিতে অবৈধভাবে বসবাসরত ৫ লাখের বেশি অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার জন্য একটি নতুন ‘রয়্যাল ডিক্রি’ অনুমোদন করেছে। এর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় কয়েকটি দেশের অভিবাসীরা। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৈধ রেসিডেন্স অনুমতি, কাজ করার অধিকার ও স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা পাওয়া যাবে।
এর আগে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী দাতুক সেরি আর. রামানন দেশটির বৈধভাবে কর্মী নিয়োগ নিয়ে দেশটির জাতীয় দৈনিক দ্য স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের জন্য আমরা নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর কথা ভাবছি। এ পদ্ধতিটি এখনো চূড়ান্তকরণের পর্যায়ে রয়েছে। তবে শিগগিরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শেষে বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।
এদিকে, গত ২৭ জানুয়ারি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন সোশ্যালিস্ট জোট সরকার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে একটি যুগান্তকারী রয়্যাল ডিক্রি অনুমোদন দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ৪৬ সেকেন্ডের এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ বলছেন আমরা স্রোতের বিপরীতে যাচ্ছি। কিন্তু অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া কবে থেকে চরমপন্থা হয়ে গেল? আর সহানুভূতি কবে থেকে ব্যতিক্রমী বিষয় হলো?’
ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন নিয়মিতকরণের ঘটনা খুবই বিরল। এর আগে ইটালি, ফ্রান্স, গ্রিস এবং সর্বশেষ পর্তুগালে এ ধরনের উদ্যোগ দেখা গেলেও বর্তমানে ইউরোপজুড়ে নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া কঠোর শর্তে সীমাবদ্ধ।
ইউরোপের অনেক দেশে যখন অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, তখন স্পেনের এই সিদ্ধান্ত ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। তবে সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘স্পেন মর্যাদা, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের পথেই এগোচ্ছে।’
আগামী এপ্রিল থেকে এই ডিক্রির অধীনে আবেদন গ্রহণ শুরু হতে যাচ্ছে। তবে এই সুবিধার জন্য আবেদনকারীকে অবশ্যই গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর আগে থেকে স্পেনে বসবাসকারী হতে হবে বলে দেশটির মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
সরকারি ডিক্রি অনুযায়ী, এই নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হতে হলে আবেদনকারীদের নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। এগুলো হলো-
সময়সীমা : আবেদনকারীকে অবশ্যই ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর আগে স্পেনে প্রবেশ করতে হবে।
অবস্থানের প্রমাণ : আবেদনের সময় তাকে স্পেনে অন্তত টানা পাঁচ মাস ধরে বসবাসের প্রমাণ দেখাতে হবে। আবেদনকারীর স্পেন বা অন্য কোনো দেশে কোনো ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড থাকা চলবে না।
আশ্রয়প্রার্থী : যারা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে এসে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য আবেদন করেছেন এবং বর্তমানে অনিয়মিত অবস্থায় আছেন, তারাও এই সুবিধার আওতায় পড়বেন।
অপ্রাপ্তবয়স্ক : যারা বর্তমানে নিয়মিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরাও সরাসরি এই সুবিধার আওতায় আসবে এবং তারা টানা পাঁচ বছরের জন্য বৈধতার সুযোগ পাবেন।
নিয়মিতকরণের প্রভাব ও সুবিধা : -
দেশটির সরকার জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় বৈধতা পেলে অভিবাসীরা প্রাথমিকভাবে এক বছরের জন্য রেসিডেন্স ও ওয়ার্ক পারমিট পাবেন। বৈধতার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যেকোনো স্থানে বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি পাবেন। এতে করে দীর্ঘদিনের শ্রমশোষণ ও 'স্ল্যাভারি' বা দাসত্বের মতো পরিস্থিতির অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। রেসিডেন্স পারমিট পেলে অভিবাসীরা সরাসরি স্পেনের সরকারি স্বাস্থ্যবিমা এবং সোশ্যাল সিকিউরিটি সিস্টেমের আওতায় চলে আসবেন। দেশটির অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রী এলমা সাইজ জানিয়েছেন, স্পেনের সোশ্যাল সিকিউরিটি তহবিলের ১৬ শতাংশের অবদান রাখছেন অভিবাসীরা।
এই নিয়মিতকরণের ফলে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাবে এবং অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে বহু শ্রমিক মূল অর্থনীতিতে যুক্ত হবেন। সরকারি হিসাবে প্রতি অভিবাসীর নিয়মিতকরণে বছরে প্রায় চার হাজার ইউরো নিট ট্যাক্স সুবিধা হবে। নতুন এই নিয়মে বৈধতার জন্য আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে আগামী এপ্রিলে এবং চলবে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ ডেস্ক স্থাপন এবং অনলাইন পোর্টালের সুবিধা দেবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ডার্ক টু হোপ/এসএইচ