মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬,
১৪ মাঘ ১৪৩২
বাংলা English हिन्दी

মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
অর্থনীতি
কোনও উদ্যোগেই কমাতে পারলো না মূল্যস্ফীতি, উল্টো বেড়েছে
নিউজ ডেস্ক
Publish: Wednesday, 21 January, 2026, 9:00 AM

বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য ও জ্বালানি তেলের দর কমেছে, ডলার সংকট অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে দেশ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য আবার উদ্বৃত্তে ফিরেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়ছে—এমন ইতিবাচক সূচকের পর স্বাভাবিকভাবেই দেশের বাজারে মূল্যস্ফীতি কমার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। দেশে মূল্যস্ফীতি কমার বদলে আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে মানুষের ভোগান্তি কমেনি বরং আরও বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে দীর্ঘদিন ধরে যে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। এর মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে নির্বাচনি অর্থনীতি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। নির্বাচনি ব্যয়, বাজারে অতিরিক্ত নগদ অর্থের প্রবাহ, রেমিট্যান্স বৃদ্ধিজনিত তারল্য এবং অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয়ের চাপ একত্র হয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।

নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে অর্থপ্রবাহ

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংস্কার ইস্যুতে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে সরকারি ব্যয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকদের ব্যয় বহুগুণে বেড়েছে। প্রবাসীরাও নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে অর্থ পাঠাচ্ছেন, যার একটি অংশ রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াচ্ছে। ফলে বাজারে নগদ টাকার সরবরাহ বাড়লেও সেই অর্থের বড় অংশ যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে।

বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশে সুফল নেই

২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, গম, ভোজ্যতেল, চিনি, দুধের গুঁড়া এবং জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ২০ ডলার কমেছে। চালের দাম টনপ্রতি ৬০ ডলারের বেশি কমেছে। পাম অয়েল, সয়াবিন তেল ও গমের দামও নিম্নমুখী ছিল। অথচ বাংলাদেশের বাজারে এসব পণ্যের দাম কমেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। আমদানি মূল্য ও খুচরা দামের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে, যা বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও প্রতিযোগিতার অভাবকে স্পষ্ট করে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান মনে করেন, কেবল মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তার মতে, কৃষিপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং কার্যকর বাজার তদারকির অভাব মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।

সুদহার বাড়িয়েও নিয়ন্ত্রণ আসেনি

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করেছে। উদ্দেশ্য ছিল চাহিদা সংকোচনের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানো। কিন্তু বাস্তবে উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমেছে, অথচ বাজারে পণ্যের দাম কমেনি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি মূলত চাহিদাজনিত নয়। বরং সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি, বাজার কাঠামোর দুর্বলতা ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যই দাম বাড়াচ্ছে। তিনি সতর্ক করেন, নির্বাচন, রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত চাহিদা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

সরকারি ব্যয় ও কালোটাকার প্রভাব

চলতি অর্থবছরে নির্বাচন কমিশনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গণভোটের কারণে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রার্থীদের বাস্তব ব্যয় সরকারি সীমার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হয় বলে ধারণা করা হয়, যার বড় অংশ আসে কালোটাকা থেকে। অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী দেশের জিডিপির প্রায় ৩৮ শতাংশই কালোটাকা, যা নির্বাচনের সময় বাজারে প্রবাহিত হয়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়।

রেমিট্যান্সে তারল্য বেড়েছে

চলতি জানুয়ারির প্রথম ১৯ দিনেই দেশে এসেছে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫৬ শতাংশ বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিপুল পরিমাণ ডলার কিনে বাজারে হাজার হাজার কোটি টাকা ছাড়ছে, ফলে নগদ টাকার সরবরাহ বেড়ে যাচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যতিক্রম বাংলাদেশ

আইএমএফ ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি গড়ে ৩ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। ভারত ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারলেও বাংলাদেশে তা প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে সমস্যার মূল কারণ চাহিদা নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনার গভীর দুর্বলতা।

কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সমাধান নেই

টানা চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করেও যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না, তখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে—সুদের হার বাড়ানোই একমাত্র সমাধান নয়। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করা, কার্যকর তদারকি ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ডার্ক টু হোপ/এসএইচ
মতামত লিখুন:
http://darktohope.org/ad/1763179181.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

ভৈরবে বগি লাইনচ্যুত: ৯ ঘণ্টা পর তিন রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক
আলোচিত জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব সদস্য হত্যা : আসামি মিজান গ্রেপ্তার
দুর্নীতি দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
গ্রিসে বিস্কুট কারখানায় ভয়াবহ আগুন, নিহত ৫
বাংলাদেশিসহ ৫ লাখ অভিবাসীকে বৈধতা দিল স্পেন
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Email: [email protected]
© 2024 Dark to Hope
🔝